ঢাকা,  শুক্রবার   ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ খবর ]

স্যাটানিজম বা শয়তানের উপাসনা

তুনাজ্জিনা রেমি
প্রকাশিত: ১৪:০৩, ৭ জুলাই ২০১৮
স্যাটানিজম বা শয়তানের উপাসনা

পৃথিবীর শুরু থেকেই মানুষ অতিপ্রাকৃত শক্তির উপাসনা করে আসছে। মানুষ যখন কথাও বলতে শিখেনি, শিখেনি কোন কিছুই তখন থেকেই একটি কাল্পনিক অলৌকিক সত্ত্বার উপর পূর্ন আনুগত্য উপস্থাপন করে এসেছে। মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজ কর্মেই জড়িয়ে থাকে এই আনুগত্যের প্রভাব। এই বিশ্বাসের অনুসারেই মানুষ নানা রকমের প্রথা পালন করে থাকে।

কখনো শুভ আবার কখনো অশুভ রূপে। বহুকাল আগে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে অদ্ভুত কিছু বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের চর্চা ছিল। এরা একেকটি গোত্র বিভিন্ন কাল্পনিক ভূত-প্রেত বা অশুভ আত্মার আরাধনা করত। আর নিজেদের বিভিন্ন প্রয়োজনে এই আত্মাকে ব্যবহার করত। এই বিশ্বাসের চর্চা মূলত ছিল আফ্রিকানদের মধ্যে। তাই বিশ্বজুড়ে এটি আফ্রিকান ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কালো জাদু নামে পরিচিত। শয়তানকে কাজে লাগিয়ে ও স্বার্থপরতার উদ্দেশ্যে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির ব্যবহার করা হয়। ব্লাক ম্যাজিক সর্বাপেক্ষা অনিষ্টকারী এবং উপকারী হোয়াইট ম্যাজিকের কাউন্টারপার্ট।

 

Advertisement

প্রতিটি ধর্মেরই দুটি ভাগ রয়েছে। একটি ভালো পথ, অন্যটি খারাপ পথ। খারাপ পথ পরিচালিত হয় শয়তানের দ্বারা। তাই সব ধর্মই এই পথ থেকে দূরে থাকার জন্য সাবধান বাণী দিয়ে এসেছে কিন্তু প্রাচীন আমল থেকেই মানুষ নানা ভাবে শয়তানের উপাসনা করে এসেছে, নানা উপায়ে নিজের অসদিচ্ছাকে পূরণ করার জন্য। স্যাটানিজম বলতে শয়তানের এই উপাসনাকেই বোঝায়।  হিব্রু বাইবেল অনুসারে, যে মানুষের বিশ্বাসের ওপর আঘাত করে সেই শয়তান। গ্রিক নিউ টেস্টামেন্টে আরো বলা হয়েছে, শয়তান দ্বারা যিশুর প্রলুব্ধ হওয়ার ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে। আব্রাহামিক ধর্মে শয়তানকে তুলনা করা হয়েছে বিপথগামী দেবদূত বা দানব হিসেবে, যে মানুষকে খারাপ কাজ বা পাপ করতে অনুপ্রেরণা যোগায়। খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী শয়তানকে খ্রিস্টান ধর্মের প্রধান শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

রেনেসাঁর সময়ে, বেশকিছু জাদুর চর্চা ও আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে শয়তানি বা ধর্মবহির্ভূত এবং আরো বিস্তৃত অর্থে স্যাটানিজম হিসেবে বিবেচনা করা হত। যেসব নারীরা এইসব জাদু বিদ্যার চর্চা করতো তাদের বলা হত ডাইনী। আফ্রিকান ভাষায় এদের বলে কিনডকি। ডাইনীবিদ্যা এবং মূলধারার বাইরের যেকোন গুপ্তবিদ্যার চর্চা, অনুশীলন ও গবেষণা নিষিদ্ধ ছিল এবং সেগুলোকে তদন্তের লক্ষ্যবস্ত করা হয়েছিল। প্রাচীন নাইজেরিয়া বা আফ্রিকান দেশগুলো যেগুলো ফ্রান্স বা ব্রিটেনের মতো দেশগুলোর অধীনে ছিলো সেখানে প্রচুর নারীকে এই কারণে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এর ফলস্বরূপ, চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের প্রচেষ্টায় বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক ম্যাজিকের বিকাশ ঘটে। যা হোয়াইট ম্যাজিক নামে পরিচিত। যা আমরা এখন বিনোদনের জন্য বিভিন্ন জায়গায় দেখে থাকি। তাই মার্সিলিও ফাইকিনো, আরোৎ জোহানেস ট্রিথেমিয়াস, ও হেনরিখ কর্ণেলিয়াস আগরিপ্পা উচ্চতর গুপ্তবিদ্যা ও আচার-অনুষ্ঠানের গবেষণা করলেও উল্লেখযোগ্য কোনরূপ শাস্তির সম্মুখীন হননি।

যখন "প্রাকৃতিক জাদু" ষষ্ঠ ও সপ্তদশ শতকের শিক্ষিত ও উচ্চ শ্রেণীর মাঝে সুপরিচিত হয়ে উঠল, তখনও প্রাচীন ও আচার-অনুষ্ঠান ভিত্তিক জাদুকে শাস্তিযোগ্য বিবেচনা করা হত। বিংশ শতকের লেখক মন্টাগু সামারস "সাদা" ও "কালো" জাদুর সংজ্ঞা পরস্পর বিরোধী বলে দৃশ্যত কালো জাদুকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে তিনি বেশ কিছুদিন এ বিষয়ের উপর গবেষণা চালিয়েছেন যে, ম্যাজিকের বিস্তৃতি কোন পর্য়ন্ত হলে তা ডার্ক বা ব্ল্যাক হিসেবে বিবেচিত হবে তার আলোচনা করেছেন এবং সেই বিষয়ে উইলিয়াম পারকিন্সের পোসথুমোস, (১৬০৮) বইয়ের একটি নির্দেশিকায় উল্লেখ করেছেন:

"ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত" সকল ডাইনীর মৃত্যুদন্ড কার্যকর হবে। তিনি এর কোন ব্যতিক্রম রাখেননি এবং এই দন্ডাদেশের আওতায় পড়েছে- "সকল গণনাকারী, ঐন্দ্রজালিক, বাজিকর, জাদুকর, সাধারণভাবে যাদেরকে জ্ঞানী ব্যক্তি বা জ্ঞানী নারী বলা হয়"। অন্যদিকে, যারা চর্চা করে "good Witches যা ক্ষতিকর নয় বরং মঙ্গলকর, যা নষ্ট ও ধ্বংস করে না, বরং রক্ষা ও সহায়তা করে” তারাও কঠোর শাস্তির অধীন হবে”। তবে স্যাটানিজম এধরণের কোন বিভাজন রেখা টানেনি। জাদু জাদুই, তা যে ধরণেরই হোক না কেন এবং সৎ বা অসৎ যে উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হোক না কেন। একজন স্যাটানিস্টকে- জাদুকর হিসেবে কোনটা ভাল তা বাঁছাই করতে পারার সাথে সাথে তার লক্ষ্য অর্জনে জাদুর শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতাও থাকতে হবে। বস্তুত, স্যাটানিজম কোন সাদা আলোর ধর্ম নয় বরং এর রীতিনীতি জীবনের পার্থিব, জাগতিক যার সবকিছুই মূর্তপ্রতীক শয়তান দ্বারা শাসিত।

উইকিপিডিয়া অনুসারে স্যাটানিস্ট দুই ধরণের হয়ে থাকে। এক, যারা যুক্তিবাদী ও বস্তুবাদে বিশ্বাসী অর্থাৎ নাস্তিক স্যাটানিস্ট। এটিকে এক ধরণের ধর্ম হিসেবে মানা হয়। এ ধর্মকে ল্যাভেয়ান স্যাটানিজমও বলা হয়ে থাকে। ১৯৬৬ সালে অ্যান্তন ল্যাভেয়ান এর প্রচার শুরু করে। তারা শয়তানকে মানুষের সহজাত সুপ্ত প্রবৃত্তির প্রতীক বলে মনে করেন। দ্বিতীয়ত, যারা অধ্যাত্ববাদে বিশ্বাসী অর্থাৎ আস্তিক স্যাটানিজম-এ বিশ্বাসী। আস্তিক স্যাটানিজমকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যাতে আছে কালো যাদুর উপর বিশ্বাস স্থাপন, যা শয়তানের পূজার মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে। আস্তিক স্যাটানিজমে শিথিলায়নের রীতি এবং আত্নার উন্নয়নও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আস্তিক স্যাটানিস্টরা যাদের পূজা করে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো লুসিফার ও বাইল। লুসিফার মনে করা হয় শুকতারাকে। শুক্র হলেন হিন্দুধর্মে একজন দানব এবং লুসিফার হলেন খ্রিস্টান ধর্মে তথাকথিত স্যাটান। লুসিফারকেই অন্যতম শয়তান ভেবে উপাসনা করা হয়ে থাকে। তারপর আসা যাক বাইলের কথায়। খ্রিস্টান ধর্মমতে, তিনি নরকের সাতজন যুবরাজের মধ্যে অন্যতম একজন । তাকে শয়তানদের উচ্চপদস্থ কেউ বা অনেকে তাকেই শয়তান মনে করে। ইসলাম ধর্ম আবির্ভাবের পূর্বে মক্কায় অধিকাংশই বাইলের উপাসনা করতো।

স্যাটানিজমের মূলমন্ত্র হচ্ছে প্রতিদিন বা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর খারাপ কাজ করতে হবে। যে যত বেশি খারাপ কাজ করবে সে তত তাড়াতাড়ি তার লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে। প্রাণের বলিদান এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। প্রতিমাসে কোনো প্রাণী খুন করতে হবে এবং বছরে একবার নরহত্যা । তারা ব্ল্যাক মাস নামে এক ধরনের অনুষ্ঠান পালন করে যা কিছুটা হিন্দুদের পূজোর মতো তবে কিন্তু তা করা হয় গোপনে। যেখানে মানুষকে অপবিত্র করাই হলো মূল নীতি। সেটা বিকৃত যৌনাচার, নরহত্যা বা যে কোনরকমের পাপের মধ্য দিয়ে হতে পারে।

বিভিন্ন নৃত্বাত্তিকগণ প্রাচীনকাল থেকে সমাজে প্রচলিত যাদু বিধান গুলো পর্যালোচনা করে এদের বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগ করার চেষ্টা করেছেন। স্যার জেমস জর্জ ফ্রেজারের মতে যাদুবিদ্যার বিধান গুলো প্রধানত দুই রকমের।

  • Homeopathic Magic - এই যাদু বিধান সবসময় শত্রুকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে শত্রুর প্রতিমূর্তি (মোম, মাটি, কাঠ, কাপড়), বা ছবি ইত্যাদি তৈরি করে পুড়িয়ে, বা ছুড়ি দিয়ে কেটে ধ্বংস করা হয়! ধারণা করা হয়, মূর্তিটিকে যেভাবে কষ্ট দেয়া হবে, অপরদিকে যার নামে ব্ল্যাক ম্যাজিক করা হচ্ছে ঐ ব্যক্তিটিও তেমনিভাবে যন্ত্রনা বা আঘাত পাচ্ছে। তবে এই যাদু আবার অনেক সময় মানুষে উপকার বা ভালোর জন্যেও ব্যাবহার করা হয়। যেমনঃ ইন্দোনেশিয়ার সমুত্রা দ্বীপে একটা এমন একটা যাদু বিধান আছে যার সাহায্যে কোন নারীর সন্তান না হলে, তার জন্য এই জাদু করা হয়। একটা কাঠের ছোট শিশু বানিয়ে নি:সন্তান নারীটির কোলে বসিয়ে দিয়ে আদর করা হয়। এর ফলে তার সন্তান হবে এমনটি ভাবা হয়! কখনো কখনো রোগের চিৎকসার জন্যও এই ধরণের যাদুর প্রয়োগ দেখা যায়! যেমন প্রাচীন হিন্দু সমাজে জন্ডিস (পান্ডুর) রোগের চিকিৎসার জন্য মন্ত্র পাঠ করে রোগীর চোখের হলুদ অংশ সূর্যের কাছে পাঠানো হত!!
  • Contagious Magic: এই ধরনের যাদু বিধানের মাধ্যমে বিশ্বাস করা হয় মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশ বিশেষ যেমন চুল, নখ, থুথু বা ব্যবহার করা বস্ত্রের মাধ্যমে যাদু করে মানুষের ক্ষতি বা উপকার দুটাই করা সম্ভব! মালয়ে এমন এক ধরনের যাদু বিধানের প্রচলন দেখা যায় যেখানে শত্রুর আঙ্গুলের নখ, চুল, ভ্রু, থুথু ইত্যাদি সংগ্রহ করে মোমের সাহায্যে শত্রুর একটা অবিকল প্রতিরূপ তৈরি করে তা ছয় দিন ধরে মোমের আলোয় ঝলসাতে হয় এবং সাত দিনের দিন মূর্তিটি পুড়িয়ে ফেললে শত্রুর মৃত্যু হবে!

স্যাটানিজমের চিহ্ন ও কালো যাদুকরদের প্রতীক পঞ্চকোণ। এছাড়াও রয়েছে ইনভার্টেড পেন্টাগ্রাম, বেফোমেট, হেক্সাগ্রাম, লাভেয়ান স্যাটানিজম, ভ্যাম্পায়ারিজম সহ নানা প্রতীক। শয়তানের এসব প্রতীককে ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ানরা কাজে লাগিয়ে এসেছেন যুগ যুগ ধরে। শয়তানের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন সভ্যতার মানুষের বিশ্বাস ছিল সেটি হচ্ছে- শিং। ব্ল্যাক ম্যাজিক চর্চায় শিং তাই অপরিহার্য। এক সময় বিখ্যাত জাদুকর ছিলেন যোহান রোসা। তার একটা মন্ত্রপুত অংটি ছিল। যাতে একটা প্রেতাত্দাকে আটকে রেখেছিলেন আর তাকে দিয়েই তিনি সব কাজ করাতেন। তার মৃত্যুর পর প্রকাশ্য জনসভায় আংটিটা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। গর্ভবতী নারীদের প্রসব বন্ধ করা থেকে শুরু করে যৌনাকাঙ্খা চিরতার্থ করার মতো বীভৎস সব জাদু বিধানের চর্চা হতো তখন। ওই সময় বিশ্বাস করা হতো, বশীকরণের মাধ্যমে মানুষকে দাস বানিয়ে রাখা যায়। যে কোনো বিপজ্জনক কাজে যাওয়ার আগে ‘প্রয়োজনীয় মন্ত্রপুত জামা’ পরে যাওয়ার রীতি ছিল। কুমারী মেয়েরা বড়দিনের এক সপ্তাহ ধরে ঘরে এ ধরনের জামা বুনত। ‘বাণ’ ছোড়ার কথা বাংলাদেশে অপরিচিত নয়, মধ্যযুগের এই (Magical Arrow) ধারণাটার ব্যাপক প্রচার ছিল।

এছাড়াও রয়েছে নানা ধরণের মন্ত্র। এসব মন্ত্র পড়তে প্রচুর মানসিক শক্তি দরকার হয়। যে ব্ল্যাক ম্যাজিক করে তার জীবনও অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে থাকে। দাঁড়িয়ে বা বসে সঠিক উচ্চারণে গুরুগম্ভীর স্বরে নির্দিষ্ট মন্ত্রটি পাঠ করতে হয়। মন্ত্রের প্রত্যেকটি শব্দের আলাদা আলাদা শক্তি আছে এবং ভাল ফলাফল পেতে সবগুলোর সমন্বিত প্রয়োগ যথোপযুক্ত হতে হয়। আর যদি কোন আত্মা বা শয়তানকে ডাকা হয়, তবে মন্ত্র উচ্চারণের পূর্বে অবশ্যই তার প্রকৃত নাম জানা থাকতে হবে। এছাড়াও মন্ত্রপাঠের সময় আশেপাশে কোন লোক থাকা চর্চাকারীর জন্যে ভয়ানক বিপদ বয়ে আনতে পারে। এক  পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে স্যাটানিস্ট ধর্মে অনুপ্রাণিত লোকের সংখ্যা ১৫ লক্ষ এবং বেশিরভাগ উপাসনাকারীই রাশিয়া, আমেরিকা ও ম্যাক্সিকোতে বসবাস করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!